বিবিসিকে দেওয়া ইমেইল–ভিত্তিক এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে মানবাধিকার লঙ্ঘন, হত্যা এবং পরিকল্পিত দমন-পীড়নের অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। গত বছরের ছাত্র–জনতার আন্দোলনের সময় জীবনহানির ঘটনার জন্য তাকে দায়ী করে যে অভিযোগগুলো উঠেছে, সেগুলোকেও তিনি “অসত্য ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” হিসেবে দাবি করেছেন।
বিবিসির গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের সংবাদদাতা আনবারাসান ইথিরাজনকে পাঠানো উত্তরগুলোর ভিত্তিতে তৈরি সাক্ষাৎকারটি শুক্রবার (১৪ নভেম্বর) বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস ও বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত হয়। ১৭ নভেম্বর ঘোষণার অপেক্ষায় থাকা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়কে ঘিরে এই সাক্ষাৎকারকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
চলমান বিচারকে ‘রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের পরিচালিত প্রহসন’ বললেন তিনি
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দাবি করেন, তার অনুপস্থিতিতে পরিচালিত বিচার প্রক্রিয়া “একটি রাজনৈতিক নাটক,” যা তাকে এবং তার দলকে রাজনীতি থেকে চূড়ান্তভাবে সরিয়ে দেওয়ার কৌশল। রাষ্ট্রপক্ষ ইতোমধ্যে মামলায় সর্বোচ্চ দণ্ড চেয়ে আবেদন করেছে।
তার বক্তব্য, “আমাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। আইনজীবী নিয়োগের স্বাধীনতাও পাইনি। সবকিছু আগেই সাজানো ছিল।”
ভারত আশ্রয় ও পূর্বের সাক্ষাৎকার নিয়ে বিতর্ক
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর এটাই বিবিসির নেওয়া তার প্রথম সাক্ষাৎকার। এর আগে রয়টার্স, এএফপি ও ইন্ডিপেন্ডেন্টে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারগুলো নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক তৈরি হয়। তিন মাধ্যমেই একই দিনে সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হওয়ায় সেটির উৎস নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। পরবর্তীতে ভারতের সাপ্তাহিক ‘দ্য উইক’-এ তার লেখা বলেও একটি নিবন্ধ ছাপা হয়, যা নিয়েও বিভ্রান্তি ছড়ায়।
বাংলাদেশ সরকার ওই প্রসঙ্গে ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনারকে তলব করে আনুষ্ঠানিক উদ্বেগও জানায়। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন এই সাক্ষাৎকার সামনে আসে।
গণঅভ্যুত্থান, নিহতদের সংখ্যা এবং জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ
ছাত্রনেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর সহিংসতার ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা উদ্বেগ জানায়। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা দাবি করেছেন, সেই সময়কার সহিংসতায় ১,৪০০ জন পর্যন্ত নিহত হয়েছিলেন।
যদিও শেখ হাসিনা এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেন। তার বক্তব্য, “পরিস্থিতি কঠিন ছিল—এটা সত্য। কিন্তু নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ আমার কাছ থেকে যায়নি।”
ফাঁস হওয়া অডিও, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সাবেক আইজিপিকে ঘিরে তদন্ত
২০২৪ সালের জুলাইয়ের একটি ফাঁস হওয়া অডিও ক্লিপে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছেন—এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে বিবিসি জানায়। আদালতে সেই অডিও বাজানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে তিনি কোনো নির্দেশ দেওয়ার কথা অস্বীকার করেন।
অন্যদিকে একই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করা হয়েছে এবং সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন দোষ স্বীকার করেছেন বলে জানানো হয়।
গোপন আটককেন্দ্র ও নিখোঁজদের অভিযোগ
শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশে “আয়নাঘর” নামে পরিচিত গোপন আটককেন্দ্রগুলো নিয়ে নতুন তথ্য সামনে আসে। অভিযোগ, এসব স্থানে বছরের পর বছর মানুষকে বিচারবহির্ভূতভাবে আটক রাখা হয়েছিল।
তবে এসব কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কোনো জ্ঞান থাকার বিষয়টি তিনি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। তার ভাষায়, “সরকারি কর্মকর্তাদের অপব্যবহার থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া উচিত, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে এসবের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা নেই।”
ভবিষ্যৎ নির্বাচন ও আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আগেই আরোপিত নিষেধাজ্ঞা থাকায় দলটি আগামী নির্বাচনেও অংশ নিতে পারবে কি না, তা অনিশ্চিত। এদিকে, শেখ হাসিনার আইনজীবীরা জাতিসংঘে জরুরি আপিল করে বলেছেন যে, চলমান বিচার যথাযথ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করছে না।
সোমবার ঘোষণা হতে যাওয়া রায়কে ঘিরে রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। নিহতদের পরিবার, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা একে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত বলে বর্ণনা করছেন।
