শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ আগুন: ধ্বংসস্তূপে কোটি টাকার মালামাল, তদন্তে নাশকতার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে

বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক 

রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ এখন এক টুকরো ধ্বংসস্তূপ। শনিবার দুপুরে লাগা ভয়াবহ আগুনে পুড়ে গেছে কোটি কোটি টাকার রপ্তানি-আমদানি পণ্য, ওষুধশিল্পের কাঁচামাল, গার্মেন্ট স্যাম্পল এবং আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন—ক্ষতির পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের বেদনাভরা দিন

রোববার সকালে ধোঁয়ায় মোড়া ভবনের সামনে জড়ো হয়েছিলেন বহু ব্যবসায়ী। কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েছেন, কেউ হতাশ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ভেতরের দিকে।
গার্মেন্ট ব্যবসায়ী মো. বেনজীর আহমেদ বলেন,

“আমাদের স্যাম্পল প্রোডাক্টসহ সবকিছুই পুড়ে গেছে। এই ক্ষতি ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য ভয়াবহ।”

কার্গো ভিলেজের ভেতর ৬৮টি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার অফিস ছিল, যার মধ্যে ২০টির বেশি নিয়মিত কার্যক্রম চালাত। সেখানে চীন, ভারত, জার্মানি ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আনা পণ্য মজুত ছিল। আগুনে অধিকাংশ পণ্য সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে বলে ধারণা করছে ব্যবসায়ীরা।

 ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্য

আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রায় ২৬ ঘণ্টা লেগেছে বলে জানায় ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স।
পরিচালক লে. কর্নেল তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন,

“অত্যন্ত দাহ্য পদার্থ, সংকীর্ণ কাঠামো ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাবের কারণে আগুন নেভাতে সময় লেগেছে।”

তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেরির পাঁচটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে—
১️⃣ দাহ্য কেমিক্যালের আধিক্য
২️⃣ স্টিল কাঠামোর তাপ শোষণ
৩️⃣ অপরিষ্কার ও গাদাগাদি পরিবেশ
৪️⃣ দুর্বল অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা
৫️⃣ ছোট ছোট স্টিলের ঘেরা কাঠামো ভেদ করে ঢুকতে সময়ক্ষেপণ

তদন্তে নাশকতা নাকি দুর্ঘটনা?

সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে দেখছে। বাণিজ্য ও বেসামরিক বিমান পরিবহন উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে বলেন,

“নাশকতা বা অবহেলা—কোনো কিছুই তদন্তের বাইরে রাখা হবে না।”

তিনি আরও জানান, প্রাথমিক তদন্তে কোনো অসদাচরণের তথ্য না মিললেও নিরাপত্তা ঘাটতি ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এসেছে।

ওষুধশিল্পে বড় আঘাত

একাধিক আমদানিকারক জানিয়েছেন, আগুনে ওষুধশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল পুড়ে গেছে।
এমএসজিএস কোম্পানির কর্মকর্তা মাহতাব উদ্দিন বলেন,

“আমরা ক্যানসার ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধ তৈরির উপকরণ আনতাম। সব পুড়ে গেছে। এর প্রভাব পড়বে দেশের স্বাস্থ্যখাতে।”

 গার্মেন্টস শিল্পেও ধাক্কা

রপ্তানিকারক পিটি গ্রুপের এজিএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,

“ফ্যাব্রিক, সুতা, ডাইং মেশিনের যন্ত্রাংশ—সব ধ্বংস হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ অন্তত ১০ কোটি টাকা।”

বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এনামুল হক খান জানান,

“এই আগুনে অসংখ্য স্যাম্পল ও শিপমেন্ট ধ্বংস হয়েছে। দেশের পোশাক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।”

বিমান ও বেবিচকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এবং বেবিচক উভয়েই পণ্য সংরক্ষণে দায়িত্বে থাকলেও নিরাপত্তায় গাফিলতি ছিল।
খায়রুল আলম ভূঁইয়া মিঠু, সহসভাপতি, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন বলেন,

“আমরা নিয়মিত চার্জ দিই। তারপরও নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যর্থতা স্পষ্ট। এখন এই ক্ষতির দায় নেবে কে?” ইমেজ ক্রাইসিসের শঙ্কা

বিকেএমইএ নির্বাহী সভাপতি মো. হাতেম বলেন,

“এত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আগুন লাগা দেশের জন্য বড় ইমেজ সংকট। বিদেশি বায়ারদের আস্থা নষ্ট হবে।”

এদিকে এক কাস্টমস কর্মকর্তা জানান, কার্গো ভিলেজ দীর্ঘদিন ধরেই ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি পণ্য রাখছিল, আর টিনশেড ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ ছিল দুর্বল।

রূপপুর প্রকল্পের সরঞ্জামও পুড়েছে

তদন্তে জানা গেছে, আগুনে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের কয়েকটি চালানও নষ্ট হয়েছে। এসব সরঞ্জাম খালাসের অপেক্ষায় ছিল রোববার সকালে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *