মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে যে জাতীয় নিরাপত্তা নীতি উন্মোচন করেছেন, তাতে ইউরোপজুড়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষত—নতুন কৌশলের ভাষা, অভিবাসনবিরোধী ইঙ্গিত এবং ‘সভ্যতার অস্তিত্ব সংকট’–বিষয়ক মন্তব্যগুলো ইউরোপের চরম ডানপন্থী রাজনীতির সঙ্গে ‘অস্বস্তিকর সাদৃশ্য’ তৈরি করছে বলে মন্তব্য করছেন বিশ্লেষকেরা।
ওয়াশিংটন থেকে কঠোর বার্তা
৩৩ পৃষ্ঠার নথিতে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে—বহু বছর ধরে ইউরোপ অভিবাসন নীতিতে দুর্বলতা দেখিয়েছে, যার ফল ‘সামাজিক অস্থিরতা ও পরিচয় সংকট’। নথিতে পশ্চিমা সভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে যে সতর্কতা দেওয়া হয়েছে, তা ইউরোপের ডানপন্থী দলগুলোর প্রচারণায় ব্যবহৃত প্রচলিত স্লোগানের সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায়।
এএফডি (জার্মানি), ভক্স (স্পেন), লেগা (ইতালি), ফ্রান্সের ফ্রন্ট পপুলার—এদের রাজনৈতিক বয়ানে যে ‘সংস্কৃতি বদলে যাওয়ার’ ভীতি থাকে, ট্রাম্প প্রশাসনের নিরাপত্তা নীতিতে সেই সুরই যেন আরও উঁচুস্বরে শোনা যাচ্ছে।
‘গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’ তত্ত্বের ছায়া?
ইউরোপের কয়েকজন নীতিনির্ধারক ও গবেষক বলেন—নতুন মার্কিন নীতির বক্তব্যগুলো বহু আগেই কট্টর-ডানপন্থীরা ব্যবহার করত।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, নথির ভেতরের ভাষা এমনভাবে সাজানো যে তা ‘গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’ ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে পরোক্ষভাবে বৈধতা দেয়—যেখানে বলা হয়, ইউরোপের মূল জনসংখ্যা অভিবাসীদের ঢলে ‘প্রতিস্থাপিত’ হচ্ছে।
মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে ট্রাম্পের বাড়তি আগ্রহ
চ্যাথাম হাউস ও অন্যান্য নীতি-গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলছে, নতুন নীতিতে পশ্চিম ইউরোপ নয়, বরং মধ্য–পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
হাঙ্গেরি বা স্লোভাকিয়ার মতো দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অনেক বিষয়ে সুর মেলায়—বিশেষত ইইউ–বিরোধী অবস্থান, অভিবাসন নিয়ে কঠোর মনোভাব এবং ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ভিন্নধারার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে।
ইউরোপের প্রতিক্রিয়া: ‘হস্তক্ষেপ নয়, সহযোগিতা চাই’
জার্মানি, ফ্রান্সসহ বেশ কয়েকটি দেশের কর্মকর্তারা সরাসরি জানিয়েছেন—ইউরোপ তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়গুলো নিজস্বভাবে সামলাতে সক্ষম।
জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মন্তব্য করেন, ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা সহযোগিতা মূল্যবান হলেও অভিবাসন ও বাকস্বাধীনতার মতো বিষয়ে ইউরোপ বাইরের ‘নৈতিক দিকনির্দেশনার’ প্রয়োজন বোধ করে না।
ন্যাটো ও প্রতিরক্ষা বাজেট নিয়ে চাপ
নতুন মার্কিন নীতি আবারও ইঙ্গিত দিয়েছে—ইউরোপ প্রতিরক্ষায় পর্যাপ্ত অর্থ না বাড়ালে ২০২৭ সালের পর যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোতে তাদের ভূমিকা নতুন করে বিবেচনা করতে পারে।
ইউরোপীয় দেশগুলো প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন বলছে—এটি যথেষ্ট নয়।
সম্ভাব্য ফলাফল: ইউরোপে নতুন রাজনৈতিক ঢেউ?
নীতি-বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন—ট্রাম্প প্রশাসনের এই দৃষ্টিভঙ্গি ইউরোপের সাংস্কৃতিক ভীতিকে আরও উসকে দিতে পারে।
এতে চরম-ডানপন্থীরা ‘মার্কিন সমর্থন’ পাওয়ার অনুভূতি পেতে পারে, যা আগামী নির্বাচনগুলোতে প্রভাব ফেলতে পারে—বিশেষত যেখানে অভিবাসন ও পরিচয় রাজনীতি বড় ভূমিকা রাখে।
ইউরোপের মূলধারার রাজনীতিবিদদের চোখে এটি যুক্তরাষ্ট্রের একরকম ‘একতরফা আধিপত্যবাদী’ অবস্থান—যা উভয় মহাদেশের মূল্যবোধভিত্তিক সহযোগিতার উপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
