দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বিরল শক্তির একটি ট্রপিক্যাল ঝড় কয়েকটি দেশে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস সৃষ্টি করেছে। গত এক সপ্তাহে ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কায় মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৪৩৫ জনের, আর নিখোঁজ রয়েছেন আরও বহু মানুষ। ঝড়টি মালাক্কা প্রণালী অতিক্রম করার পর টানা বর্ষণে একের পর এক অঞ্চল ডুবে গেছে, ধসে পড়েছে ঘরবাড়ি—এখনো স্বাভাবিক হয়নি জনজীবন।
ইন্দোনেশিয়ায় বিধ্বংসী পরিস্থিতি
সুমাত্রা দ্বীপজুড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানায়, ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী টানা বর্ষণে সৃষ্টি হওয়া বন্যা ও পাহাড়ি ঢল মিলিয়ে ৩০৩ জনের প্রাণহানি নিশ্চিত হয়েছে। এখনো বহু মানুষ失踪, আর অন্তত ৫০০ জন আহত হয়ে চিকিৎসাধীন।
উদ্ধারকর্মীরা জানায়—অনেক গ্রাম এখনো পৌঁছানোই সম্ভব হয়নি। ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ জীবিত আছেন কি না তা জানতে তাদের হেলিকপ্টার ও নৌযানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। পশ্চিম সুমাত্রাতেই মৃত্যু বেড়ে ৬১ জনে দাঁড়িয়েছে এবং ৯০ জন এখনও নিখোঁজ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ লাখের বেশি মানুষ, আর নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে প্রায় ৭৫ হাজার মানুষ।
উত্তর সুমাত্রা ও আচেহ প্রদেশেও ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে। ভেঙে পড়েছে বহু সেতু ও সড়ক। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা ধসে পড়ায় উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হচ্ছে।
অন্য দেশেও ঝড়ের ভয়াবহতা
একই ঝড়ে থাইল্যান্ডে মারা গেছে ১৪৫ জন, আর মালয়েশিয়ায় দুইজন। অঞ্চলজুড়ে আউটফল হল—কয়েক মিলিয়ন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত এবং বৃহৎ এলাকাজুড়ে মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে।
শ্রীলঙ্কায় রেকর্ডসংখ্যক মৃত্যু
ভারত অতিক্রমের আগে ঝড়ের প্রভাবে শ্রীলঙ্কায় শুরু হয় ভয়াবহ বৃষ্টিপাত। দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র জানায়, পুরো দেশে মৃত্যু বেড়ে ১৩২ জনে দাঁড়িয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন কমপক্ষে ১৭৬ জন।
বন্যায় ১৫ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছে ৪৪ হাজারেরও বেশি মানুষ। ক্যান্ডি ও আশপাশের পাহাড়ি অঞ্চলে নতুন ভূমিধসের খবর পাওয়া গেছে, বহু সড়ক এখনও ডুবে আছে পানিতে।
কেলানি নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় রাজধানী কলম্বোর পার্শ্ববর্তী এলাকায় বাধ্যতামূলক সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ জারি করা হয়। পুরো পরিস্থিতি সামলাতে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীকে কাজে লাগানো হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সহায়তা আসতে শুরু করেছে
শ্রীলঙ্কা ইতোমধ্যে বৈশ্বিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে। ভারত দ্রুত সাড়া দিয়ে ত্রাণবাহী দুটি বিমান পাঠিয়েছে এবং সাগরে থাকা যুদ্ধজাহাজ থেকেও খাদ্যসহ জরুরি সরঞ্জাম দিয়েছে। আরও আন্তর্জাতিক সাহায্য আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিপর্যস্ত দুই দেশে এখনও সংকট অব্যাহত
বৃষ্টি কমলেও অনেক এলাকায় পানি কমার কোনো লক্ষণ নেই। বিচ্ছিন্ন অঞ্চলগুলোতে ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে। নিখোঁজদের খোঁজে উদ্ধার অভিযান চলছে অব্যাহতভাবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো আশঙ্কা করছে—এ বন্যা সাম্প্রতিক বছরের যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ঝড় দুর্বল হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কার সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—পুনর্গঠন আর সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উদ্ধারকাজ।
