দূষিত স্ট্রিট ফুডে বাড়ছে ডায়রিয়া ও খাদ্যজনিত রোগ

নগর জীবন লাইফস্টাইল
234

ডেস্ক রিপোর্ট 

রাজধানীর মিরপুরে রাজমিস্ত্রি শাফায়াত জামাল কয়েকদিন ধরে তীব্র ডায়রিয়ায় ভুগছেন। দৈনিক কাজের ফাঁকে তিনি নিয়মিত ফুটপাতে আখের রস খেতেন। গত রবিবার রস পান করার পরই হঠাৎ পেটব্যথা ও ডায়রিয়া শুরু হয়। অসুস্থ অভিজ্ঞতার পর তিনি জানান, এখন থেকে বাইরে কোনো অস্বাস্থ্যকর খাবার খাবেন না। তার মতো প্রতিদিন হাজারো মানুষ রাস্তার খাবার খেয়ে অসুস্থতার ঝুঁকিতে পড়ছেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় দেড় লাখ মানুষ ফুটপাতের খাবারের ওপর নির্ভর করে। একজন বিক্রেতার অবহেলায় শত শত মানুষ ব্যাকটেরিয়া আক্রান্ত হতে পারেন।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার জনপ্রিয় চটপটি, ঝালমুড়ি, পানিপুরি, আখের রসসহ বেশিরভাগ স্ট্রিট ফুডে পাওয়া গেছে কলিফর্ম, ই-কোলাই, স্যালমোনেলা এবং ভিব্রিওসহ ক্ষতিকর জীবাণু। দীর্ঘমেয়াদে এগুলো ডায়রিয়া, পেটের সংক্রমণ, হেপাটাইটিস ও খাদ্যবিষক্রিয়ার কারণ হয়। বিশেষ করে আখের রস, বেলপুরি, নুডলস ও জাম্বুরার মাখায় জীবাণুর মাত্রা ভয়াবহ বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ফুটপাতের খাবারের প্রায় সবকটিতেই মলের জীবাণুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। যেখানে লেবুর রস ও তেঁতুল পানিতে তুলনামূলক কম ব্যাকটেরিয়া দেখা গেলেও তা নিরাপদ নয়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত পানি ও উপকরণ আসে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ থেকে, যা রোগ বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখে।

খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা জানান, ঢাকার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ স্ট্রিট ফুড বিক্রি হয় ফুটপাতে, আর বাকি অংশ ড্রেনের পাশে। বেশিরভাগ বিক্রেতার হাত, পানির পাত্র এবং খাবার তৈরির জায়গায় থাকে ময়লা ও জীবাণু। অনেকেই শিক্ষিত নন এবং খাদ্য নিরাপত্তা সম্পর্কে কোনো প্রশিক্ষণও পাননি। তারা দীর্ঘ সময় রাস্তায় থাকেন পরিচ্ছন্ন টয়লেট বা বিশুদ্ধ পানির সুযোগ ছাড়া।

বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গেছে, চটপটির প্রতি পরিবেশনে কোটি সংখ্যায় ই-কোলাই ও শত শত সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়া থাকে। ঝালমুড়ি ও আখের রসেও লক্ষাধিক ক্ষতিকর জীবাণু শনাক্ত করা হয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, প্রতি ১০ হাজার মানুষের মধ্যে অন্তত ৭ জন স্ট্রিট ফুডের কারণে রোগে আক্রান্ত হন।

এ ছাড়া রাস্তার ফল কাটায় ব্যবহার করা হয় অনেক সময় কৃত্রিম রাসায়নিক, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং দীর্ঘমেয়াদে লিভার ও কিডনিতে সমস্যা তৈরি করতে পারে।

যদিও অনেক বিক্রেতা পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার চেষ্টা করেন, বাস্তবে ধুলাবালু, গাড়ির ধোঁয়া এবং অপরিষ্কার পানি থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ভাগ্যের ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে ক্রেতাদের।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, স্বাস্থ্যবান জাতি ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই ফুটপাতের খাবার পুরোপুরি বন্ধ না করে বিক্রেতাদের প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স, পরিষ্কার পানি নিশ্চিতকরণ ও নিয়মিত তদারকি জরুরি। তাদের মতে, আতঙ্ক নয়, প্রাথমিক প্রতিরোধ ও কঠোর মনিটরিংই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *