প্রতি মাসে সড়কে বাড়তে থাকা মৃত্যুর মিছিল আমাদের সামনে এক কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরছে—আমাদের রাস্তাঘাট এখন আর চলাচলের উপযোগী পথ নয়, বরং জীবনের জন্য অদৃশ্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত অক্টোবর মাসে সড়ক, রেল ও নৌ—সব মিলিয়ে ৫০০ জনের মতো মানুষের জীবন ঝরে গেছে নানা দুর্ঘটনায়। এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং শত শত পরিবারে অনন্ত শোকের গল্প।
সড়কেই মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, অপরিকল্পিত রাস্তা, অতিরিক্ত গতি এবং অযোগ্য চালকের বেপরোয়া চালনার কারণে প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ মারা যাচ্ছেন ও পঙ্গু হচ্ছেন। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—দুর্ঘটনার কারণ আমরা বহুদিন ধরেই জানি, তবুও প্রতিকার এখনো দৃশ্যমান নয়।
দেশের উন্নয়নের কথা বলতে গেলে আমরা বড় বড় অবকাঠামোর কথা বলি—ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে, সেতু। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব রাস্তার প্রকৃত মূল্য কী, যদি সেই পথেই মানুষের জীবন নিরাপদ না থাকে? নিরাপদ সড়ক ছাড়া কোনো উন্নয়নই শেষ পর্যন্ত জনগণের কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না।
দুর্ঘটনা কমাতে যা জরুরি
সড়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি দুর্ঘটনার প্রধান চালিকাশক্তি। আইনের প্রয়োগ দুর্বল, মামলা হয় কিন্তু বিচার হয় না, মালিক-চালকের জবাবদিহি নেই। এতে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যেসব পদক্ষেপ জরুরি—
-
ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও মহাসড়ক দ্রুত সংস্কার
-
রাতের ভ্রমণে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা
-
দক্ষ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালক তৈরি
-
ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা
-
রাস্তার পাশে বেআইনি পার্কিং ও বাজার উচ্ছেদ
-
মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত যানবাহনের নিবন্ধন নিয়ন্ত্রণ
-
ওভারটেকিং নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার
-
বিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র এবং গণমাধ্যমে ধারাবাহিক সচেতনতা কর্মসূচি
আইন, শৃঙ্খলা, সচেতনতা এবং জবাবদিহি—এই চারটি স্তম্ভকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে না পারলে সড়ক নিরাপত্তা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
নিরাপদ সড়ক কোনো বিলাসিতা নয়, মৌলিক অধিকার
অসংখ্য প্রাণহানির পরও যথাযথ পদক্ষেপের অভাব আমাদের উদ্বিগ্ন করে। একটি দেশের অগ্রগতি তখনই টেকসই হয়, যখন মানুষ নিরাপদে তার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। তাই এখন আর বিলম্ব নয়—সড়ককে নিরাপদ করতে সরকার, পরিবহন মালিক, চালক, পথচারী—সব পক্ষেরই দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি।
সড়ক যেন মৃত্যুফাঁদ না হয়ে ওঠে, বরং মানুষের চলাচলের নিশ্চিন্ত পথ হয়—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। নিরাপদ সড়ক শুধু দাবি নয়, এটি মানুষের জীবন রক্ষার অঙ্গীকার।
